স্বাস্থ্য ভালো রাখার উপায়গুলো জেনে নিনঃ

মানবদেহের সুস্বাস্থ্য কয়েকটি প্রাথমিক নিয়মাবলীর উপর নির্ভরশীল। স্বাস্থ্যকে অটুট রাখতে কতগুলি সুঅভ্যাস গ্রহণ করা এবং কুঅভ্যাস বর্জন করা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা যেমন- শারীরিক পরিচ্ছন্নতা, পোশাক পরিচ্ছন্নতা এবং ঘরবাড়ীর পরিচ্ছন্নতা। এ সমস্ত জিনিস স্বাস্থ্যের জন্য একান্ত আবশ্যক।

শারীরিক পরিচ্ছন্নতা:

গোসল শারীরিক পরিচ্ছন্নতার সুন্দর উপায়।গোসল সব বয়সের এবং সকল মৌসুমে স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ফলপ্রসূ। গ্রীষ্মকালে প্রতিদিন গোসল করা একান্ত আবশ্যক।তবে শীতকালে সপ্তাহে কমপক্ষে দুইবার গোসল করা উচিত। যুবক এবং স্বাস্থ্যবান লোক ঠান্ডা পানিতে গোসল করতে পারে তবে ছোট ছেলেমেয়ে এবং বৃদ্ধ মানুষের সামান্য গরম পানিতে গোসল করা উচিত। ব্যায়াম করার সামান্য পূর্বে বা ব্যায়াম করার সঙ্গে সঙ্গে গোসল করা উচিত নয়।এই রকম ক্লান্তিকর কাজের পর বা স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করার পর সঙ্গে সঙ্গে গোসল করা উচিত না।গর্ভবতী মহিলা বেশীক্ষণ গোসল করবেন না তাহলে দুর্বল এবং ক্লান্ত হয়ে যাবেন।গোসল করার পরে পরিষ্কার তোয়ালে দিয়ে শরীর ভাল করে মুছবেন।সামান্য গরম পানিতে গোসল করা সব বয়সের লোকের জন্য সব মৌসুমে লাভদায়ক।৫ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে গোসল শেষ করা উচিত। গোসল করার সময় শরীরের ময়লা এবং জীবানু দূর করার জন্য সাবান ব্যবহার করতে হবে।

পোশাকের পরিচ্ছন্নতা:

সাধারণত যে সকল কাপড় আমাদের শরীরের সংস্পর্শে থাকে যেমন গেঞ্জি,আন্ডার ওয়্যার,সেমিজ,অন্তর্বাস ইত্যাদি প্রতিদিন পরিবর্তন করা এবং সাবান দিয়ে ভালভাবে পরিষ্কার করা দরকার।অপরিষ্কার কাপড় স্বাস্থ্যের জন্য হানীকারক।বিছানার চাদর,বালিশের কভার,তোয়ালে অন্তত প্রতি সপ্তাহে ধোয়া উচিত।

ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা:

ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার মধ্যে ত্বক,মুখ,নখ,চুল এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রতঙ্গ অন্তর্ভুক্ত। এসব অঙ্গের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে গোসল অবশ্য প্রয়োজন। মুখ ও দাতের পরিচ্ছন্নতায় বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। দাত পরিষ্কারের সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে নীম বা বাবলা গাছের নরম ডাল দিয়ে মেসওয়াক তৈরি করে ব্রাশ করা।মেসওয়াক শুধুমাত্র দাতের খাদ্যকণাকে বের করে না বরং দাতের মাড়ি মজবুত রাখে।আজকের দিনের জন্য টুথব্রাশই অধিক পরিচিত। কিন্তু ব্রাশ মাড়ির জন্য ক্ষতিকর। কেউ কেউ আঙ্গুলের মাথায় মাজন লাগিয়ে দাত মাজেন।এতে দাত সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার হয় না।মাজন ব্যবহারের পর ব্রাশ ব্যবহার করা যেতে পারে।প্রতিদিন সকালে জিহ্বা পরিষ্কার করতে হবে।নখ ও চুল পরিষ্কার রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহে একবার হাত ও পায়ের নখ কাটা উচিত। বগলের চুল এবং নাভীর নিচের চুল কমপক্ষে মাসে একবার পরিষ্কার করা উচিত। এইভাবে মাথা, গোফ এবং দাড়ির চুল সুন্দরভাবে ছেঁটে পরিষ্কার করা উচিত। মাথার এবং দাড়ীর চুলে ভাল তেল লাগিয়ে নিয়মিত চিরুনী করা উচিত।

ঘরবাড়ীর পরিচ্ছন্নতা:

দরজা জানালা সময় সময় খোলা রাখা উচিত যাহাতে বিশুদ্ধ বাতাস আসা যাওয়া করে এবং সূর্যের আলো ঢুকে।প্রতিদিন ঘরের ধুলা ময়লা ভালভাবে পরিষ্কার করা উচিত। ঘরের মধ্যে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ যেন না হয়।অপরিষ্কার পানি বাহির করার জন্য নালা বা ড্রেনের ব্যবস্থা করা দরকার।গোসলখানা এবং পায়খানার পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখা উচিত।

আহার:

আহারের সময় নির্দিষ্ট হওয়া উচিত। খাদ্য,বয়স,মৌসুম ও আবহাওয়া অনুসারে হওয়া দরকার।

শিশুদের খাদ্য:

শিশুদের খাদ্য তরল হওয়া উচিত। যাহাতে সরলতায় খেতে ও হজম হতে পারে।শিশুদের খাদ্য প্রোটিন যুক্ত হওয়া উচিত যেমন দুধ,মাখন,ডিম,মাংসের ঝোল,পাতলা ডাল,ফলের রস এবং শাকসবজির ঝোল ইত্যাদি।

বড়দের খাদ্য:

সম্পূর্ণ আহার রুটি, চাউল,তরকারী, ডাল,মাংস,মাছ,মাখন,শুষ্ক ফল,শাকসবজি ইত্যাদি এইরকম সব খাদ্য যা সহজে হজম হয়ে যায়।

বৃদ্ধদের খাদ্য

হালকা এবং তাড়াতাড়ি হজম হয় এমন খাদ্য খাওয়া উচিত। বেশি তেল,ঘি,এবং চর্বি জাতীয় খাদ্য বা দেরিতে হজম হওয়া খাদ্য খাওয়া উচিত নয়।

আহারাদি সম্বন্ধে নির্দেশ:

মৌসুম এবং আবহাওয়ার সঙ্গে আহারাদি পরিবর্তন করা উচিত। মাছ,মাংস এবং ডিম সাধারণভাবে শীতকালে খাওয়া উচিত। দুধ,দই,তরকারি গ্রীষ্ম মৌসুমে খাওয়া দরকার।বর্ষাকালে অধিকতর সবুজ শাকসবজি যেমন লাউ,ঝিঙ্গা, পটল এবং দই খাওয়া উচিত।খুব পেট ভরে এবং বারবার খাওয়া উচিত নয়।সব সময় ক্ষুদার চেয়ে কম খাওয়া উচিত।দুইবার খাওয়ার মাঝে কমপক্ষে তিন ঘন্টা ব্যবধান হওয়া দরকার এবং গরম মশলা তথা বেশী চর্বি জাতীয় খাদ্য খাওয়া উচিত নয় কারণ এসব স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।

আহারের সময়:

সকালে হালকা খাদ্য, দুপুরে এবং রাতে বা সন্ধ্যার পর ভারী খাবার খাওয়া উচিত। যদি দরকার বোধ হয় সন্ধ্যার সময় এক কাপ চা,দুধ এবং ফল খাওয়া যেতে পারে।

কখনএবংকিভাবেখাবেন:

১. সম্পূর্ণ ক্ষুধার্ত না হওয়া পর্যন্ত খাবার গ্রহণ করা উচিত নয়।
২.ক্ষুধার চাহিদা অনুযায়ী খাবার গ্রহণ করাই উচিত, অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণ বর্জনীয় ।অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণ শুধুমাত্র বদহজমই করে না, বিভিন্ন রোগও সৃষ্টি করে।
৩.রান্নার জন্য খাদ্যদ্রব্য বেশ ভাল ভাবে সিদ্ধ করে এবং গরম গরম খাওয়া উচিত। কেননা আধাসিদ্ধ খাদ্য খেলে হজম ক্রিয়া খারাপ হতে পারে।
৪. খাবার রুচিকারক,পরিষ্কার এবং সুস্বাদু হওয়া উচিত যাতে রসনায় তৃপ্তি আসে।
৫.খাদ্যদ্রব্য ভালভাবে চিবিয়ে খাওয়া উচিত।
৬.খাবার সবসময় হাসিখুশি এবং শান্তির ভাব হওয়া উচিত ।
৭.সবসময় বেশী গরম খাদ্য খাওয়া উচিত নয়।
৮.খাওয়ার মাঝে পানি পান করা উচিত নয় বরং খাবার গ্রহনের আধা ঘন্টা পর পানি পান করা উচিত। কিন্তু গ্রীষ্মকালে খাদ্য গ্রহণের সাথে সাথে সামান্য একটু পানি পান করা যেতে পারে।গরম খাবার গ্রহণের পর ঠান্ডা পানীয় গ্রহণ করা ক্ষতিকর। খাদ্য গ্রহণের কমপক্ষে আধাঘণ্টা পর বরফ পানি খাওয়া উচিত।
৯. প্রতিদিন খাদ্য গ্রহণের পর কিছু ফল-মূল, সবুজ সবজি এবং আধা কাপ দই খাওয়া উচিত ।
১০.কয়েকটি খাদ্যদ্রব্য মিলিয়ে একই সঙ্গে খাওয়া উচিত নয়।যেমন-
*ভাত এবং তরমুজ।
*ভাত এবং ছাতু।
*ডালিম, বেদানা এবং হারিসা।
*গরু ছাগলের মাথার মাংস,নিহারি(পায়া) এবং আঙ্গুর।
*মাছ এবং দুধ।
*মাংস এবং দুধ।

খাদ্যের রেসিপি মাঝে মধ্যে পরিবর্তন করা উচিত। একই রকম খাদ্য সবসময় খাওয়া ঠিক নয়,যেমন- সবসময় ভাত খেলে শরীরের মধ্যে জলীয় পদার্থের পরিমাণ বেড়ে যায় ফলে ক্ষুধামান্দ্য, ক্লান্তি, অলসতা এবং শক্তিহীনতা সৃষ্টি হয়।ঠিক তেমনি টক জাতীয় খাদ্য অতিরিক্ত খেলে শরীর শক্তিহীন হয়ে যায় রক্তের মধ্যে গরমী কম হয়ে যায় এবং অতি দ্রুত বৃদ্ধাবস্থা এসে যায়।ঠিক এই রকম মিষ্টান্ন বেশী ব্যবহারে হজম ক্রিয়া খারাপ হয়ে যায় এবং ধমনী দূর্বল হয়ে পড়ে।লবন বেশী খেলে শরীর এবং শিরা শুকিয়ে যায়।বেশী মরিচ এবং মশলাযুক্ত খাদ্য খেলে পেটে জ্বালা করে এবং অন্ত্রের মিউকাস মেমব্রেনে ঘা হয়ে যায় তাতে আলসার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

পোশাক:

গরম এবং ঠান্ডা থেকে রক্ষা পাবার জন্য পোশাকের গুরুত্ব অপরিসীম। আবহাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে পোশাক পড়া উচিত। গ্রীষ্মকালে সূতি,হালকা রঙ্গের কাপড় এবং শীতকালে পশমী,উলেন কাপড় পড়া উচিত।গ্রীষ্ম কালে সিনথেটিক ও টাইট পোশাক পড়া উচিত নয় কারণ উহা ত্বকের ক্ষতি করে।শিশুদের পোশাকের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।শীত ও গ্রীষ্ম দুই ঋতুতেই ঢিলেঢালা পোশাক গ্রহণীয় উচিত।

নিদ্রা:

নির্দিষ্ট সময়ে নিদ্রায় যাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভাল।যে শক্তি কাজের মাধ্যমে ক্ষয় হয় ঘুমালে তার পূর্তি হয়ে যায়।গভীর নিদ্রা শারীরিক শক্তির পূর্ণ বিশ্রাম। এতে শরীর পুনরায় নতুন উদ্যমে কার্যরত হয়।গভীর নিদ্রার জন্য খাদ্য উত্তমরূপে পরিপাক হওয়া উচিত। কারণ অহজমকৃত খাদ্য পেটে থাকলে নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটে এবং দুঃস্বপ্ন দেখা দেয়।

নিদ্রার ভাল সময় রাত। রাত্রেই গভীর নিদ্রা হয়।রাত্রে তাড়াতাড়ি শোওয়া এবং সকালে তাড়াতাড়ি উঠার অভ্যাস করা উচিত। কিছু কিছু লোক রাত্রে দেরিতে নিদ্রা যায় এবং সকালে দেরিতে ওঠে।কিন্তু এই অভ্যাস স্বাস্থ্যের জন্য ভাল নয়।খাওয়া এবং শোওয়ার মাঝে কমপক্ষে দুই ঘন্টার ব্যবধান হওয়া উচিত। শিশুদের ১৫ থেকে ২০ ঘন্টা, কিশোরদের ১০ থেকে ১২ ঘন্টা, যুবকদের ৮ ঘন্টা এবং বৃদ্ধদের ৬ ঘন্টা নিদ্রা দরকার।নিদ্রা খুব অল্প বা অতিমাত্রায় হওয়া দুইটাই স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর।

ব্যায়াম:

প্রত্যেক মৌসুমে কোন না কোন রকমের ব্যায়াম দরকার তাহাতে স্বাস্থ্য সুগঠিত হয় এবং বলিষ্ঠ থাকে।ব্যায়াম দ্বারা রক্ত চলাচল অধিক হয়। অনেক রকমের ব্যায়াম আছে। সব থেকে সহজ ব্যায়াম হচ্ছে পায়চারী করা।এটি সকল ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব তবে পায়চারীর সময় পোশাক মৌসুম অনুযায়ী হওয়া দরকার যেমন শীতকালে গরম কাপড় ব্যবহার করা দরকার। খোলা বাতাসে ভ্রমণ করা উচিত। সাধারণত ৪০ মিনিট থেকে ৫০ মিনিট পর্যন্ত পায়চারী যথেষ্ট। সাতার এবং অশ্বারোহণ উৎকৃষ্ট ব্যায়াম।ব্যায়াম যত হালকা হয় ততই ভাল কিন্তু নিয়মিত স্থায়িত্ব থাকা দরকার।খেলাধুলা যেমন ফুটবল,হকি,ক্রিকেট ইত্যাদি উত্তম ব্যায়াম। বৃদ্ধাবস্থায় সামান্য ব্যায়াম করা উচিত। শরীর ম্যাসাজও একরকম ব্যায়াম। যোগব্যায়ামও অতি উত্তম এবং উপকারী।

ঔষধ ব্যবহারের সময় ও নিয়ম:

১. সাধারণত ঔষধ দিনে দুইবার সেবন করা হয়।এমতাবস্থায় সকালের ঔষধ সকালে প্রাতঃভোজনের পর এবং সন্ধ্যার ঔষধ সন্ধ্যার সময় সেবন করা উচিত। অথবা প্রেসক্রিপশন নিয়ম অনুযায়ী সেবন করা উচিত।
২.সকালে খালিপেটে খাওয়ার ঔষধ মলত্যাগের পরে সেবন করা উচিত।
৩. আহারের পর সেবন করা ঔষধ আহারের ৫ থেকে ১৫ মিনিট পর সেবন করা উচিত।
৪.শোয়ার সময় ঔষধ রাতে আহারের প্রায় দুই ঘন্টা পরে সেবন করা উচিত।
৫.সিদ্ধ করার ঔষধ একই সময়ের জন্য মাত্রা নির্ধারিত করা হয়েছে।

ঔষধের মাধ্যম:

জিনসেন্ট পানি,দুধ,মধু,চা- এর সহযোগে ঔষধ সেবন করলে উত্তম ফল পাওয়া যায়।গরমকালে ঠান্ডা এবং শীতকালে সামান্য গরম পানি ব্যবহার করা উচিত।

লেখক,
এম সেলিম রহমান

(“এ” ক্যাটাগরি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক)

adminsashthokotha

Back to top