ডেংগু সম্পর্কে বিস্তারিত

 ডেঙ্গু জ্বর কি?

এটি একটি ভাইরাস জনিত রোগ, এই ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করার ৪-৫ দিনের মধ্যে জ্বর হয়। জ্বরের তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট হতে পারে। এই ভাইরাস এডিস মশা ছড়িয়ে দেয়। যে মশাগুলোকে ডেঙ্গু মশা বলা হয় থাকে।

 ইতিহাস:

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায় ১৯৭৯-৮০ সালে এশিয়া, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকা ডেঙ্গুর মহামারিতে পতিত হয় তখন থেকেই বিষয়টি আলোচনায় আসে। সে সময় থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব অনেক ছিল, আর ১৯৭০ এর দিকে এসে এটি শিশু মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।ডেঙ্গু শব্দটি এসেছে সোহাইলি ভাষা থেকে, ডিঙ্গা পেপো শব্দ থেকে ডেঙ্গু শব্দের উৎপত্তি যার অর্থ হচ্ছে খারাপ আত্মা, জানা যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের গোলামদের যদি ডেঙ্গু জ্বর হত তখন তাদের হাটার ভঙ্গিমা ডান্ডি নৌকার মত দেখা যেত, তা থেকে ডান্ডি জ্বর বলা হত, ধীরে ধীরে ডেঙ্গু নাম ধারণ করেছে।ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির হাড়ে প্রচন্ড ব্যথা অনুভুত হয়, এতটাই ব্যথা হয় যে মনে হবে হাড় ভেঙ্গে যাচ্ছে তাই এই রোগকে ব্রেক বোন ফিভারও বলা হয়।

 এডিস মশার উৎপাত কোথায় বেশি:


এডিস মশা মোটামুটি একটি অভিজাত প্রজাতির মশা, বড় বিল্ডিং দালান কোঠাতে এদের বসবাস। এরা ফ্রেশ পানিতে ডিম পাড়ে আর বংশবৃদ্ধি করে। চিপস প্যাকেট, ডাবের খোসা যেখানে পানি জমে সেখানে ডিম পারে।

এডিস মশা কখন বেশি কামড়ায়:

এই মশা সকাল সন্ধায় বেশি কামড়ায়, হাতে আর পায়ে বেশি কামড়ায়, কারণ এরা সকালে বেলায় এবং সন্ধাবেলায় Active থাকে। দিনের বেলায় যে কোনো সময় কামড়াতে পারে, তবে রাতে সাধারণত
কামড়ায়না।

ডেঙ্গু জ্বর কেন হয়:

ডেঙ্গু জ্বর হয় ভাইরাস থেকে, ডেঙ্গু মশা নামের ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী মশার কামড়ে ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।ফলে ৪-৫ দিনের মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর হয়, আবার যদি সাধারণ মশা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড় দেয় তবে সে মশাটিও ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হবে।এই মশা আবার সুস্থ মানুষের গায়ে কামড় দিলে সে মানুষটি ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হবে।এভাবে চারদিকে ডেঙ্গু ছড়িয়ে যাবে।এভাবেই ডেঙ্গু ভাইরাস জনিত জ্বরে মানুষ আক্রান্ত হয়।

 ডেঙ্গু ভাইরাসের সুপ্তিকাল :

একটি ইনফেক্টেড মশা যদি কাউকে কেবল এক কামড় দেয়, তখন মশার স্যালাইভাতে অবস্থিত ডেঙ্গু ভাইরাস মশা থেকে মানুষের শরীরে চলে আসবে এবং কামড় দেওয়ার ৩-১৪ দিনের মধ্যে জ্বর আসবে।
কেউ মশার কামড় খাওয়ার ১৪ দিন পর যদি জ্বর আসে, তাহলে বুঝবে যে, জ্বর ডেঙ্গুর কারণে নয়, অন্য কারণে এসে থাকতে পারে।। কারণ Dengue Virus এর incubation period ৩-১৪ দিন, বেশির ভাগ পেশেন্টে মশার কামড়ের ৫-৬ দিনের মধ্যে জ্বর দেখা যায়।

ডেঙ্গু জ্বরের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য:

প্রথম ৩-৪ দিন (ক্লাসিকাল ডেঙ্গু):
১. জ্বরের সাথে সারা শরীর ব্যথা
২. চোখের পিছনে খুব ব্যথা (Retro orbital
headache)
৩. পেটে ব্যথা
৪. শরীর চুলকানি ও Rash
৫. সর্দি কাশি তেমন একটা থাকেনা
৬. জয়েন্ট পেইন এবং মাংশপেশিতে ব্যথা
৭. পেটে ও বুকে পানি জমা
৮. তীব্র মাত্রার continuous জ্বর
৯. কাঁপুনি থাকবেনা

প্রথম ৩-৪ দিন পর ৮০-৯০% রোগী রিকভারি স্টেজে চলে যায়, ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকে, সুস্থ হবার আগে শরীরে Rash দেখা দিতে পারে।

আর ১০-২০ % রোগীর ক্ষেত্রে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার গড়ে উঠবে। তখন জ্বর শুরু হওয়ার ৪-৫ দিন পর এ ধরনের উপসর্গ দেখা যায়:
১। বমির সাথে রক্ত
২। ডায়েরিয়া, সাথে রক্ত
৩। নাক দিয়ে রক্ত
৪। দাতের মাড়ি থেকে রক্ত
৫। Subcutaneous hematoma ইত্যাদি
এ অবস্থায় রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

হেমোরেজিক স্টেজের পর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে রোগী শকে চলে যেতে পারে। তখন একে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম বলে। এসময় মারাত্মক নিম্ন রক্তচাপ হতে পারে এবং রোগী মারাও যেতে পারে।

 ডেঙ্গু জ্বর কে কিভাবে অন্যান্য ভাইরাস জ্বর থেকে আলাদা করা যায়:

১। ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা Rhino Virus দিয়ে জ্বর হলে সাথে সর্দিকাশি থাকবে। কারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপের ভাইরাস গুলি প্রধানত শ্বাসনালীকে আক্রান্ত করে। তাই সর্দিকাশি খুবই সাধারণ উপসর্গ। আর ডেঙ্গু তে সর্দিকাশি থাকেনা।
২। ইনফ্লুয়েঞ্জাতে Generalized headache থাকবে। আর ডেঙ্গুতে Retro orbital
headache তথা চোখের পিছনে ব্যথা থাকবে।
৩। Influenja বা অন্য ভাইরাসের ক্ষেত্রে রক্ত সহকারে বমি কিংবা পায়খানা খুবই কম দেখা যায়। আর ডেঙ্গুতে এইটা খুব সাধারণ।
৪। অন্যান্য ভাইরাল জ্বরে মাংসপেশি ও হাড়ে ব্যথা কম থাকে, ডেঙ্গু তে বেশি থাকে।
৫। ভাইরাল হেপাটাইটিস এর কারণেও জ্বর হতে পারে, তবে সেইক্ষেত্রে জন্ডিস দেখা দিবে।
৬। টাইফয়েডের ক্ষেত্রে দূষিত পানি কিংবা বাহিরের খাবার, পানি পান ইথ্যাদির ইতিহাস থাকবে,
আর জ্বর শুরু হবার আগে ডায়েরিয়া হয়ে থাকে,
প্রথম সপ্তাহে ব্লাড কালচার করলে সালমোনেলা টাইফি পজিটিভ আসবে।

 ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলো কি:

সাধারণত তেমন লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা যায় না। তবে যাদের দেখা যায় তাদের এরকম কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে তা হচ্ছে, মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব, গায়ে লাচে গোটা গোটা দাগ দেখতে অনেকটা ঘামাচির মত, চোখের দিকে ব্যথা, সারা শরীরের হাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা। অনেক ক্লান্তিবোধ করা।জ্বর ১০৪ বা ৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত থাকা। তবে সাধারণত ডেঙ্গু জ্বর ৪-৭ দিন পর্যন্ত থাকে। তবে কারও কারও জ্বর ভালো হয়ে আবার আসতে পারে এটকে ফিজিক্যাল ফিভার বলে। ৩দিন থেকে সর্বোচ্চ ১৪ দিনও থাকতে পারে।কারও কারও ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ ও হতে পারে। মেয়েদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত ঋতুস্রাবও হতে পারে।শরীরে পানি জমতে পারে,কিডনিতে পানি জমতে পারে, বমির সাথে রক্ত যেতে পারে । রক্তচাপ কমে যেতে পারে, জন্ডিস দেখা দিতে পারে, হার্টবিট কমে যেতে পারে,শরীরের হাত পা বা অন্যান্য অঙ্গগুলো ঠাণ্ডা হয়ে আসা, প্রস্রাব কমে যাওয়া। এসব উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তারে কাছে যেতে হবে।


 ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ রূপ:

ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াভহ রূপ হলো ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফেভারের সঙ্গে সার্কুলেটরি ফেইলিউর হয়ে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হয়। এর লক্ষণ হলো-রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া। নাড়ির স্পন্দন অত্যন্ত ক্ষীণ ও দ্রুত হওয়া। শরীরের হাত-পা ও অন্যান্য অংশ ঠান্ডা হয়ে যায়। প্রস্রাব কমে যায়। হঠাৎ করে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

                   রোগ নির্ণয়:

ডেঙ্গু প্রধানত ক্লিনিকালি নির্ণয় করা হয়ে থাকে, আর নিশ্চিত হবার জন্য CBC করে Platelet count দেখা যেতে পারে।
Platelet Count কমে যাবে কিংবা Lower Marginal limit এ চলে আসবে। অর্থাৎ, Thrombocytopenia দেখা যাবে। আর ডেঙ্গু দ্বারা লিভারও আক্রান্ত হতে পারে, তখন Serum ALT, AST অনেক বেড়ে যাবে।আর ডেঙ্গুতে জ্বর শুর হবার প্রথম ৪ দিনের মধ্যে NS1 Antigen দেখা যেতে পারে। প্রথম ৪ দিনের মধ্যে NS1 positive আসবে। ৪ দিন পর NS1 করা, না করা একই কথা। কারণ ৪ দিন পর NS1 নেগেটিভ আসে।

                 ডেঙ্গু প্রতিরোধ:

 করণী কি? ডেঙ্গু প্রতিরোধ করার জন্য প্রথমে নিজের চারপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। যেহেতু ডেঙ্গু ভাইরাস ডেঙ্গু মশা থেকে ছড়ায় তাই মশার আস্তানা ধংস করে দিতে হবে। সাধারণত ডেঙ্গু মশা শরের বিভিন্ন দালান ও আশে পাশে জমে থাকা পানি থেকে জন্ম নেয়। ছাদে জমে থাকা পানি,ডাবের খোসায় জমে থাকা পানি, ফুলের টবে ডেঙ্গু মশা ডিম পারে।ডেঙ্গু মশা গ্রামে বা বস্তিতে হয় না। তাই নিজের চারপাশ ভালো ভাবে পরিষ্কার রাখতে হবে।কোথাও ৪-৫ দিনের বেশি সময় পানি জমা করে রাখা যাবেনা। এমন স্বচ্ছ পানিতে ডেঙ্গু ডিম পারে বংশ বিস্তার করে। তাই এগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে।ডেঙ্গু মশা সাধারণত সকাল ও সন্ধা বেলা কামড় দেয় তবে যে কোনো সময় কামড়াতে পারে। দিনের বেলায়ও মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হবে, প্রয়োজনে মশা নিধন ব্যবস্থা করতে হবে, কয়েল এবং স্প্রে ব্যবহার করতে হবে।শীত কালে এডিস মশা, ডেঙ্গু মশা থাকেনা, সাধারণত গরম কালে বা শীতের আগে এগুলোর জন্ম হয়। তাই এসময় একটু বেশি সচেতন থাকতে হবে।এছাড়া আরও অনেক উপসর্গ দেখা দিতে পারে, তাই নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিৎ। ডাক্তারে কাছে জরুরি ভিত্তেতে যাওয়া উচিৎ এবং পরীক্ষা করে ডেঙ্গু কিনা নিশ্চিত হতে হবে, তবে ৩- ৪ দিনের জ্বরে অনেক সময় ডেঙ্গু কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়না। এসব কিছু ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করলে জানতে পারবেন।

                                ডেঙ্গু জ্বরের প্রতিকার :


মূলত ডেঙ্গু জ্বরের কোনো চিকিৎসা নেই। নিয়মিত বিশ্রাম নেয়া তরল জাতীয় খাবার খাওয়া। প্যারাসিটামল বা নাপা জাতীয় ঔষধ সেবন করা। যেমন ডাব খেতে পারেন,স্যালাইন খেতে পারেন, গ্লুকোজ ইত্যাতি শরবত ও পানীয় জাত খাবার। সাধারনত ডেঙ্গু জ্বর ৭-৮ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায় এমনকি চিকিতসা না করালেও ভালো হবে। তবে ভালো না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রামে থাকতো হবে। ভেজা কাপড় দিয়ে জ্বরে আক্রান্ত রোগির শরীর মুছে দিতে হবে। প্রচণ্ড ব্যথার কারণে এসপিরিন বা ব্যথানাশক ঔষধ খাওয়া যাবেনা, কেননা এসব ঔষধ খেলে শরীর থেকে রক্তক্ষণ হতে পারে। আর স্যালাইন জাতীয় খাবার খেতে না পারলে শিরাপথে ডাক্তারগণ দিয়ে থাকেন। সব মিলিয়ে যদি কেউ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে থাকেন তবে জরুরি ডাক্তারের পরামর্শ নিবেন। অবহেলার কারণে মৃত্যুও হতে পারে।

adminsashthokotha

Back to top